রাজশাহী-১ সংসদীয় আসনটি তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত। এক সময় এই আসনটি বিএনপির শক্ত দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। ভৌগোলিক বিশালত্ব, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বের কারণে এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম ‘ভিআইপি’ আসন হিসেবে পরিচিত। অতীতে এই আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। সে কারণেই প্রতিবারের মতো এবারও এই আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের লড়াই দেখা যাচ্ছে।তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে গোদাগাড়ী উপজেলায় ভোটার দুই লাখ ৯৬ হাজার ৯১০ জন এবং তানোর উপজেলায় এক লাখ ৭১ হাজার ৮৭০ জন। এই বিপুল ভোটারকে ঘিরেই প্রতীক ও প্রার্থীভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে উঠেছে। ভোটারদের বড় একটি অংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ হওয়ায় আসনটিতে তৈরি হয়েছে তরুণ নির্বাচনি উত্তাপ।এই আসনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে—এমনটাই ধারণা করছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারে এ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে সাধারণ ভোটারদের আলোচনায় ঘুরছে মূলত দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম। তারা হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, যার প্রতীক দাঁড়িপাল্লা, এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন, যার প্রতীক ধানের শীষ। শরীফ উদ্দিন প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই এবং এবারই প্রথম সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।এছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের মীর মো. শাহজাহান, এবি পার্টির মো. আব্দুর রহমান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আল সাআদ নির্বাচনে অংশ নিলেও তাদের প্রচারণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। অনেক ভোটার পোস্টারে ছবি দেখেও প্রার্থীদের চিনতে পারছেন না। ফলে প্রার্থীদের পরিচয় জানতে অন্যদের কাছে জানতে হচ্ছে—এমন চিত্রও দেখা যাচ্ছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই আসনের বিপুল সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের মন জয়ে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই নানা কৌশল অবলম্বন করছে। ইতোমধ্যে জামায়াতের জনসভায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের উপস্থিতি নতুন এক রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। এলাকায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের তেমন দেখা যাচ্ছে না, দলীয় কার্যক্রমও অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।এই পরিস্থিতিতে বিএনপি তাদের একসময়ের দুর্গ পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে শক্তিশালী হয়েছে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো ও জনসমর্থন। ১৯৮৬ সালে এই আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই ইতিহাস ও ব্যক্তিগত পরিচিতিকে সামনে রেখে এবারও জামায়াত ভিন্ন কৌশলে মাঠে এগিয়ে রয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।সব মিলিয়ে রাজশাহী-১ আসনে এবারের নির্বাচন পরিণত হয়েছে দ্বিমুখী শক্তির লড়াইয়ে। বিএনপির পুরনো দুর্গ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এবং জামায়াতের কৌশলগত অগ্রযাত্রার মুখোমুখি সংঘাতে শেষ পর্যন্ত কার কৌশল সফল হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।